আহলে বাইয়াত-প্রতিচ্ছবি-https://praticchabi.com
সাধারণভাবে মনে করা হয় যে, “আহলে বাইত্” (اهل بيت) মানে ‘পরিবার’ ও “আাল্” (آل) মানে ‘বংশধর’। এ পরিপ্রেক্ষিতে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে যে, হযরত ‘আলী (‘আঃ) তো রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) চাচাতো ভাই ও জামাতা; এমতাবস্থায় তিনি তাঁর আহলে বাইতের (‘আঃ) ও আালে মুহাম্মাদের (ছাঃ) সদস্য হিসেবে পরিগণিত হন কীভাবে?
“রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) আহলে বাইত্ ও বিবিগণ” গ্রন্থে – যা ধারাবাহিক নোট হিসেবে ফেসবুকে প্রকাশিত হয়েছিলো – এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। তবে উত্থিত প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে কেবল এ সুনির্দিষ্ট প্রশ্নকে কেন্দ্র করে এখানে সংক্ষেপে আলোকপাত করার চেষ্টা করছি।
শুরুতেই স্মরণ করিয়ে দিতে হয় যে, প্রত্যেক ভাষায়ই এমন অনেক শব্দ ও পরিভাষা আছে যেগুলোর মধ্যকার এককটি শব্দ বা পরিভাষা একই সাথে ভিন্ন ভিন্ন আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে এবং কতক ক্ষেত্রে একই শব্দ বা পরিভাষা একই সাথে একাধিক আভিধানিক অর্থে ও/ বা একাধিক পারিভাষিক অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আর আল্লাহ্ তা‘আলা মানুষের সাথে কথা বলেন তাদের মাঝে প্রচলিত ভাষায় এবং তারা বিভিন্ন শব্দ ও পরিভাষা যে অর্থে ব্যবহার করে থাকে তাদের নিকট স্বীয় বাণীকে সহজবোধগম্য করার লক্ষ্যে তিনি সে সব শব্দ ও পরিভাষা সে অর্থেই ব্যবহার করেন।
আরবী ভাষায়, বিশেষতঃ কোরআন মজীদ নাযিলের যুগের আরবী ভাষায় اهل শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘পোষ্য’; এতে প্রচলিত অর্থে কোনো ব্যক্তির ‘পরিবার’ বলতে যা বুঝায় তার সদস্যরা (বালেগ-নাবালেগ নির্বিশেষে), দাস-দাসী ও আশ্রিতরা অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে اهل بيت -এর আভিধানিক অর্থ ‘গৃহবাসীগণ’ অর্থাৎ একটি গৃহে বসবাসকারী লোকেরা। এ অর্থে কোনো ব্যক্তির পরিবারের লোকজন একাধিক গৃহে বসবাস করলে তার একাধিক আহলে বাইত্ হওয়ার কথা। উদাহরণস্বরূপ : কোনো ব্যক্তির দু’জন স্ত্রী আছে এবং স্বভাবতঃই তারা দু’টি স্বতন্ত্র গৃহে বসবাস করে; একই গৃহের দুই কক্ষে নয়। [বস্তুতঃ গোপনীয়তা (privacy) রক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে এটাই অধিকতর ইসলাম সম্মত; রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) স্ত্রীগণের প্রত্যেকের স্বতন্ত্র ছোট ছোট বাসগৃহ ছিলো এবং তাঁর নিজের একটি স্বতন্ত্র বাসগৃহ ছিলো। বিশেষতঃ তৎকালে মক্কাহ্-মদীনায় বর্তমান কালের ন্যায় বহু শয়নকক্ষ বিশিষ্ট অ্যাপার্টমেন্ট ছিলো না। গোপনীয়তা (privacy) পরিপূর্ণরূপে রক্ষিত হবার উপযোগী হলে একই গৃহে বা অ্যাপার্টমেন্টে একাধিক স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস অথবা একই গৃহে বা অ্যাপার্টমেন্টে স্বামী-স্ত্রী ও বালেগ সন্তানদের বসবাস যদিও নাজায়েয নয় তবে ছোট ছোট হলেও ভিন্ন ভিন্ন গৃহে বা অ্যাপার্টমেন্টে বসবাস অধিকতর ইসলাম সম্মত। ] কিন্তু কোনো ব্যক্তির স্ত্রী/ স্ত্রীগণ ও নাবালেগ সন্তানরা একাধিক গৃহে বসবাস করলেও পারিভাষিক অর্থে তারা ঐ ব্যক্তির আহলে বাইত্ (একটি অর্থে, একাধিক আহলে বাইত্ অর্থে নয়)।
অন্যদিকে নবী-রাসূলগণের (‘আঃ) নবী-রাসূল হিসেবে (অন্য ব্যক্তিদের মতো ব্যক্তি অর্থে নয়) যে আহলে বাইত্ তা ভিন্ন একটি পারিভাষিক তাৎপর্য বহন করে। একজন নবীর আহলে বাইতের মধ্যে কেবল আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষ হতে নির্বাচিত এমন মা‘ছূম্ ব্যক্তিবর্গ অন্তর্ভুক্ত হন – যাদের অস্তিত্বের ওপর সংশ্লিষ্ট নবীর আদর্শিক ধারাবাহিকতা নির্ভরশীল। ফলে একজন নবীর আহলে বাইতের মধ্যে তাঁর স্ত্রী ও সন্তানরা বা তাদের একাংশ অন্তর্ভুক্ত না-ও হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, হযরত নূহ্ (‘আঃ)-এর নাফরমান স্ত্রী ও পুত্র তাঁর আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে পরিগণিত হয় নি। হযরত নূহ্ (‘আঃ) যখন বলেন যে, তাঁর পুত্র তাঁর আহল্ তখন আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁকে জানিয়ে দেন : সে তোমার আহল্ নয় (সূরাহ্ হূদ্ : ৪৬)।
অন্যদিকে একজন নবীর স্ত্রী বা সন্তান নন এমন কেউও তাঁর আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন – যার অস্তিত্বের ওপর সংশ্লিষ্ট নবীর আদর্শিক ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকা নির্ভর করে। আল্লাহ্ তা‘আলা কোরআন মজীদে আয়াতে তাত্বহীরে (সূরাহ্ আল্-আহযাব্ : ৩৩) আহলে বাইতের সদস্যদেরকে পরিপূর্ণরূপে তথা বিশেষভাবে (تطهيراً) পবিত্রকরণের ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। আর রাসূলুল্লাহ্ (ছাঃ) আয়াতে মুবাহালাহ্ (সূরাহ্ আালে ‘ইমরান্ : ৬১) অনুযায়ী যেভাবে আমল করেন তার ভিত্তিতে শিয়া-সুন্নী নির্বিশেষে এ বিষয়ের ওপর ইজমা‘এ উম্মাহ্ প্রতিষ্ঠিত যে, রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) আহলে বাইত্ (‘আঃ) ন্যূনতম চারজন; তাঁরা হলেন : হযরত ‘আলী (‘আঃ), হযরত ফাত্বেমাহ্ (সালামুল্লাহি ‘আলাইহা), হযরত ইমাম হাসান (‘আঃ) ও হযরত ইমাম হোসেন (‘আঃ)। এতে হযরত ‘আলী (‘আঃ) অন্তর্ভুক্ত, অথচ তিনি রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) বংশধর নন; তিনি এতে রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) চাচাতো ভাই বা জামাতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন নি, বরং স্বয়ং আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষ হতে নির্বাচিত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। তেমনি হযরত ফাত্বেমাহ্ (সালামুল্লাহি ‘আলাইহা) এবং হযরত ইমাম হাসান (‘আঃ) ও হযরত ইমাম হোসেন (‘আঃ)-ও রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) কন্যা ও নাতি হিসেবে এতে অন্তর্ভুক্ত হন নি, বরং স্বয়ং আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষ হতে নির্বাচিত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। আর যেহেতু অকাট্য ‘আক্বলী দলীল অনুযায়ী রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) ইন্তেকালের পর তাঁর মা‘ছূম্ স্থলাভিষিক্ত ও তার ধারাবাহিকতা অপরিহার্য সেহেতু একই কারণে হযরত ইমাম হোসেন (‘আঃ)-এর বংশধর মা‘ছূম্ ইমামগণ (‘আঃ)ও আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) বংশধর অন্য কেউই আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত নন; যদিও আহলে বাইতের বংশধর হওয়ার কারণে আরো অনেক বুযুর্গকে ভক্তি-শ্রদ্ধাবশতঃ সম্মানার্থে আহলে বাইতের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়, কিন্তু তা আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষ হতে মনোনীত আহলে বাইতের সদস্য হিসেবে নয়।
একইভাবে আরবী ভাষায় آل শব্দটিরও একাধিক আভিধানিক ও পারিভাষিক তাৎপর্য রয়েছে। আরবী ভাষায় প্রজন্ম অর্থে نسل (নাসল্) ও বংশধর অর্থে ذرية (যুররিয়াহ্) শব্দ ব্যবহৃত হয়; দু’টি শব্দের তাৎপর্য প্রায় সমার্থক হলেও হুবহু সমার্থক নয়। উল্লেখ্য, তাৎপর্যবিজ্ঞান (Semantics) অনুযায়ী কোনো ভাষায়ই সমার্থক শব্দ বলতে কিছু নেই; বরং দু’টি শব্দের তাৎপর্যের মধ্যে ‘প্রায়’ সকল পয়েন্ট্ অভিন্ন হলে ক্ষেত্রবিশেষে সাধারণ লোকেরা শব্দ দু’টিকে সমার্থক গণ্য করে। অনুরূপভাবে আরবী آل শব্দ نسل বা ذرية শব্দের সমার্থক নয়, যদিও প্রায় সমার্থক। এ ক্ষেত্রেও, নবী-রাসূলগণের আাল্ বলতে [যেমন : আালে ইবরাহীম্ (‘আঃ) ও আলে মুহাম্মাদ্ (ছাঃ)] স্বয়ং আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষ হতে নির্বাচিত মা‘ছূম্ ব্যক্তিগণকে বুঝানো হয় – যাতে প্রধানতঃ তাঁর বংশধরদের মধ্যকার মা‘ছূম্ ব্যক্তিবর্গকে বুঝালেও কোনো নবীর পুত্রতুল্য কাউকেও অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। মুসলমানদের জন্য নামাযে আালে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর প্রতি দরূদ প্রেরণ অপরিহার্য; নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) সকল বংশধরকে এতে অন্তর্ভুক্ত করা উদ্দেশ্য নয়। কারণ, গায়রে মা‘ছূমদের প্রতি, বিশেষতঃ নাফরমানদের প্রতি দরূদ প্রেরণ অপরিহার্য হবার প্রশ্ন অবান্তর। সুতরাং পারিভাষিক অর্থে রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) আহলে বাইত্ ও আালে মুহাম্মাদ (ছাঃ) অভিন্ন এবং এতে হযরত ‘আলী (‘আঃ) সহ আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষ হতে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ শামিল রয়েছেন।
এখানে প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, পারিভাষিক অর্থে কোনো নবী-রাসূলের আহলে বাইত্ ও আাল্-এ ক্ষেত্রবিশেষে আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষ হতে অভিন্ন ব্যক্তিবর্গ অন্তর্ভুক্ত করা হলেও [যেভাবে রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) আহলে বাইত্ ও আালে মুহাম্মাদ (ছাঃ) অভিন্ন] নবী-রাসূলগণের (‘আঃ) ক্ষেত্রেও আহলে বাইত্ ও আাল্-এর তাৎপর্য অভিন্ন নয়। একজন নবীর আহলে বাইতে তাঁর স্ত্রী/স্ত্রীগণ অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন, ঠিক যেভাবে হযরত ইবরাহীমের (‘আঃ) স্ত্রীদ্বয় তাঁর আহলে বাইতে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, কিন্তু আাল্-এ কেবল সন্তান ও সন্তানতুল্য নির্বাচিত ব্যক্তিবর্গই শামিল হতে পারেন; স্ত্রী/স্ত্রীগণ শামিল হতে পারেন না। এ কারণে হযরত ‘ইমরান্ (‘আঃ)-এর স্ত্রী তাঁর আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত থাকলেও আালে ‘ইমরান্ (‘আঃ)-এ শামিল ছিলেন না।
এখানে প্রসঙ্গতঃ এ প্রশ্ন আসে যে, কোরআন মজীদে আালে ‘ইমরান্ (‘আঃ) বলতে কা’দেরকে বুঝানো হয়েছে?
হযরত মূসা (‘আঃ)-এর পিতার নাম ছিলো ‘ইমরান্ (‘আঃ), তেমনি হযরত মারইয়াম্ (সালামুল্লাহি ‘আলাইহা)-এর পিতার নামও ছিলো ‘ইমরান্ (‘আঃ)। আবার অনেকে মনে করেন যে, কোরআন মজীদে আালে ‘ইমরান্ (‘আঃ) বলতে আহলে বাইতের ইমামগণকে (‘আঃ) বুঝানো হয়েছে, কারণ, হযরত ‘আলী (‘আঃ)-এর পিতা হযরত আবূ ত্বালিব্ (‘আঃ)-এর মূল নাম ছিলো ‘ইমরান্; আবূ ত্বালিব্ ছিলো তাঁর ডাকনাম।
আাল্ বলতে সাধারণতঃ কয়েক প্রজন্ম বুঝানো হয়ে থাকে। এ কারণে “আালে ‘ইমরান্ (‘আঃ)”-এ ‘ইমরান্ বলতে হযরত মারইয়াম্ (সালামুল্লাহি ‘আলাইহা)-এর পিতা ‘ইমরান্ (‘আঃ)কে বুঝানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ। কারণ, হযরত মারইয়াম্ (সালামুল্লাহি ‘আলাইহা) ও হযরত ‘ঈসা (‘আঃ) – এই দুই প্রজন্মের পর আর তাঁর মা‘ছূম্ বংশধর ছিলো বলে কোনো অকাট্য সূত্রে জানা যায় না। অন্যদিকে আহলে বাইতের ইমামগণ (‘আঃ) রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) আহলে বাইত্ ও আালে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর অন্তর্ভুক্ত; তাঁদের এ মর্যাদা আালে ‘ইমরান্ (‘আঃ) হওয়ার মর্যাদার চেয়ে বেশী বৈ কম নয়। সুতরাং আালে ‘ইমরান্ (‘আঃ)-এ ‘ইমরান্ বলতে হযরত মূসা (‘আঃ)-এর পিতাকে বুঝানোর সম্ভাবনাই বেশী, তবে হযরত আবূ ত্বালিব্ (‘আঃ)কে বুঝানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।
০ Comments

Leave a reply

কপিরাইট © 2020-2021 প্রতিচ্ছবি কর্তৃক সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত।

যোগাযোগ করুন

আমরা এখনই কাছাকাছি নেই। তবে আপনি আমাদের একটি ইমেল প্রেরণ করতে পারেন এবং আমরা আপনার কাছে আবার আসব।

Sending

Log in with your credentials

or    

Forgot your details?

Create Account