চোর ধরা

দুই হাত পিঠমোড়া করে বাধাঁ নাসু মাফ চাওয়ার উদ্দেশ্যে যখন আকিবের সাথে থাকা প্রজেক্ট ইনচার্জ ও এডমিন অফিসারের পায়ে হুমড়ী খেয়ে পড়তে গেল তখন আকিবের ভিতর থেকে যেনে হাউ হাউ করে কান্না ফুটে বের হয়ে আসতে চাইলো। অনেক কষ্টে কান্না চেপে আকিব বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখাল।

এখন পায়ে পড়তে যাচ্ছেন কেনো, আপনাকে অনেক সুযোগ দিয়েছি আপনি সুযোগ গ্রহন করলেন না এখন আবার পায়ে পড়তে যাচ্ছেন! বললাম আপনার সাথে আর কে কে আছে? কোন প্রকারেই স্বিকার করলেন না, বললাম স্বিকার করেন আমরা আপনাকে ছেড়ে দিয়ে তাকে ধরব কিন্তু সে সুযোগ আপনি নিলেন না। লজ্জা করে না আপনার এই বয়সে চুরি করেন? এখন হাজতের খেতে মজা লাগবে দেখবেন কেমন। আকিবের কন্ঠে রাগের সুর। রাগের সুর দেখাতে গিয়েও কথা গুলো কেমন যেন কান্না মিশ্রিত মত হয়ে যায়। কয়েক মূহুর্তের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে যায় আকিব। ভাবতে থাকে নাসুর বাড়ীর লোক যখন জানবে তাদের বাবা চুরির অপরাধে থানা হাজতে তখন বাড়ীর লোকেরা তাকে কিভাবে গ্রহন করবে! হয়ত তাকে অনেক বকাবকি করবে, অনেক রাগ দেখাবে! হয়ত তার জোয়ান যুবক ছেলে যেকিনা বাবার হাড়ভাঙ্গা খাটুনির টাকায় মানুষ হচ্ছে সে হয়ত বলবে ছি বাবা! ছি! এবয়সে এসে চুরি করতে তোমার বিবেকে একবারও বাধঁলো না? এমন আরও অনেক কথা। কিম্বা হয়ত বলতেও পারে বাবা তোমাকে বাবা ভাবতে আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে, লজ্জা লাগছে। কিম্বা এর চেয়েও অনেক কঠিন কোন কথা। এ কারনে হয়ত নাসু বার বার বলতেছিল আমাকে ছেড়েদিন আমি এমন কাজ আর কখনও করব না আর আপনাদের কোম্পানীতেও থাকব না আমি এখান থেকে বের হয়ে বাসের না হয় ট্রেনের নিচেই মাথা দিয়ে আত্নহত্যা করব আমার আর কি করার ছিল। করোনার কারনে মেয়েটার চাকরী চলে গেছে আপনারা যে বেতন দেন তাতে সংসার চালাতে পারছি না, আমার আর কি করার ছিল আপনারা বলে দেন আর সিএনজির রেলিং এ সাথে ঠুকতেছিল। নাসু নাকি এক সময় দেশের একটি শির্ষস্থানীয় কটন মিলে কাজ করত। সেখানের কর্মীদের মধ্যে ওর ভালো গ্রহনযোগ্যতা ছিল। সেখান থেকে রিটায়ারমেন্ট এর পর এই কোম্পানীতে জব নেয়। যদি তাই সত্যি হয় তাহলে সে কোম্পানী নাসুর জন্য কি করেছে? অথচ নাসু তার জীবন যৌবন সব দিয়ে সেখানে কাজ করেছে। তার সেরাটুকু দিয়ে সে এখন নিঃস্ব। এখন চোর। পরিনামে থানা হাজতে।

দেশের নামি একটা রিয়েল ষ্টেট ডেভলোপার কোম্পাণীতে আকিব এক সময় প্রজেক্টে এ কাজ করত। তখন ষাটোদ্ধ বয়সের নাসু পাশের প্রজেক্টে ফায়ফরমাস খাটতো কোম্পানীর ভাষায় কিউরিং মান বলা হয় যাকে। চার মেয়ে আর এক ছেলের বাবা নাসু। ধর্মে ভিন্ন হলেও নাসুকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতো আকিব। যে বয়সে তার ছেলে সন্তানদের টাকায় চলার কথা ছিল সে বয়রসে সে নিজেকেই কাজ করে চলতে হচ্ছে। কখনও সখনও দুই পাঁচশ টাকাও ধার দিত তাকে। নাসুও আবার তার ওয়াদা মত পরিশোধ করে দিত। সে প্রায় ১০ বছর আগের কথা।

আকিব এখন প্রমোশন পেতে পেতে সেই কোম্পাণীর একটা ডিপার্টমেন্ট এর হেড। প্রজেক্ট লেবেলে এ কাজ করা মানুষদের চোখে আকিব এখন বস। কিন্তু আকিব তার অতীতের কথা কখনও ভুলে না। অতীত যেন তার চলার প্রেরনা, অতীতের স্মৃতি-বিস্মৃতি তার অনেক আপন অনেক নিকট জনের মত। কিন্তু আসলে এখানে পরিস্থিতি এমন জটিল ইচ্ছা করলেই সে নাসুর জন্য কিছু করতে পারছে না। কারন চুরি বলে কথা তাও আবার হাতেনাতে ধরা। যেকোন কোম্পানী যেকোন প্রতিষ্ঠান চোরকে আশ্রয় প্রশ্রয় দেওয়াকে পছন্দ করে না করাও উচিৎ নয়। সেটা করাটা নৈতিক দিক থেকে সমিচিন নয়; তাছাড়া মেনেজমেন্টেরও নির্দেশ রয়েছে তাকে থানায় দেওয়ার। কারন এটা একটা উদাহরণ হোক যেন ভবিৎষতে এমন কাজ করলে কেউই ছাড় না পায় এবং এমন কাজ করলে তারও এমন পরিনতি ভোগ করতে হবে এই ভেবে যেন এই কাজ আর না করে।

মেনেজমেন্ট এর নির্দেশ মত নাসুকে থানায় সোপর্দ করে আকিব তার সহকর্মীদের সাথে অফিসের গাড়ীতে বাসায় ফিরে। বাসায় ফিরে শাওয়ার নিয়ে সরাসরি বিছানায় চলে যায় রাত তখন প্রায় সাড়ে ১২টা। আকিব সাধারনত ১১ টার আগেই বিছানায় চলে যায়। আজ দেরীতে বিছানায় যাওয়ার পরও আকিবের ঘুম আসেনা। আকিব এপাশ ওপাশ করতে থাকে। কার্তিকের হালকা ঠান্ডা হাওয়া জালানা গলে আকিবের গায়ে শিরশির কাপন তোলে কিন্তু কেন জানি আকিব কাথাঁটি গায়ে নেওয়ার কষ্টটুকুও করতে চায়না। তার সবকিছু যেন অবশ-বিবশ এর মত হয়ে গেছে। মনে মনে ভাবে একটা সিডেটিভ নিই তাহলে হয়ত ঘুম আসবে কিন্তু সেটাও ইচ্ছা করে না।

শুয়ে শুয়ে সে ভাবতে থাকে পৃথীবিতে মানুষ এত অসহায় হতে পারে!

০ Comments

Leave a reply

কপিরাইট © 2020-2021 প্রতিচ্ছবি কর্তৃক সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত।

যোগাযোগ করুন

আমরা এখনই কাছাকাছি নেই। তবে আপনি আমাদের একটি ইমেল প্রেরণ করতে পারেন এবং আমরা আপনার কাছে আবার আসব।

Sending

Log in with your credentials

or    

Forgot your details?

Create Account