একজন সিএনজি চালকের দায়িত্ব ও মানবিকতা বোঁধ

সেদিন ছিল ৩০ জুলাই ২০১৫। আমার জীবনের স্মরনীয় দিন গুলোর একটি। ঘটনাটি আর ১০টি ঘটনার মতই স্বাভাবিক, অনকেরে মতে তুচ্ছ বা বিচ্ছিন্নও বটে কিন্তু আমার নিকট মানবিক মূল্যমানে এর মূল্য অনেক।

তখন আমি RANKS FC Serenade নামক একটি কনস্ট্রাকশন প্রজেক্টে কাজ করতাম। আমি ছিলাম প্রজেক্টের Inventory এর দায়িত্বে। স্বাভাবিকভাবে প্রতিষ্ঠানের নিয়মানুযায়ী প্রজেক্টর সকল মালামাল আমাকে বুঝে নিতে হত এবং বুঝিয়ে দিতে হত।

ঐদিন প্রজেক্টে ডলুর বালি (এক ধরনের বালি যা কনস্ট্রাকশন কাজে ব্যবহার হয়) এসেছিল রাত তখন .০০ টার সময়। প্রচুর  বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টির কারনে ছাতা বাঁকা হয়ে আসছিল সাথে বাতাস। সাপ্লায়ার আমাকে বালির মেজারমেন্ট বুঝিয়ে দিয়ে চলে যাওয়ার সময় বললেন, শফিক ভাই আবহাওয়া খারাপ চলেন আপনাকে আমার গাড়ীতে করে বাসায় পৌছে দিই। আমি সাপ্লাইয়ারের অফার ডিনাই করলাম কারন বালি আনলোড না হওয়া প‌র্যন্ত প্রজেক্টে অবস্থান করাটা আমার দায়িত্বের ভিতরে পড়ে যদি কোন কারনে আনলোড করতে কোনো অসুবিধা হয় বা সম্পুর্ণ বালি আনলোড না করে ট্রাক ড্রাইভার টান দিয়ে চলে যায় ইত্যাদি।

বৃষ্টির তোড় এত বেশী ছিল যে, বালি আনলোড হওয়ার পর খেয়াল করলাম কিছু বালি বৃষ্টির পানির সাথে ড্রেনে চলে যাচ্ছে। ততক্ষনে রাত .৩০ বেজে গেছে। এত রাতে লেবারদেরকে জাগিয়ে কাজ করানোটাকে সমচিন মনে হল না তাই  ষ্টোর থেকে পলিথিন বের করে সিকিউরিটি গার্ড লিটনকে বললাম পলিথিনের এক মাথা ধরার জন্য আর এক মাথা আমি ধরে বালির উপর ঢেকে দিয়ে পাশে ইট চাঁপা দিয়ে লিটনকে বাই বলে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।

খুলশি মার্টের টাভা রেস্টুরেন্টর গলির কাছে মেইন রোডে দাড়িয়ে সিএনজির জন্য অপেক্ষা করছি। বৃষ্টির কারনে শরিরে ৮০ ভাগ ভিজে গেছে। বাতাসে ছাতা ঠিক রাখা কষ্টকর হয়ে উঠেছে তাছাড়া শীত লাগছে। প্রায় ৪৫ মিনিট হয়ে গেছে সিএনজি রিকশা কিছুই আসছে না। একটি সিএনজি খুব দ্রুত বেগে চলে গেল। হাত ইসারা করার পরেও থামালো না। মনে মনে খুবই হতাশ হলাম। ভাবলাম প্রজেক্টে আবার ফিরে যাব কিনা! কিন্তু প্রজেক্টে কোন একোমডিশন না থাকাতে ফিরে যেতে মন চাইলো না।

কিছুটা আশা কিছুটা নিরাশা নিয়ে সামনের দিকে পা বাড়ালাম। ভাবলাম কোনো যানবাহন যদি না পাওয়া যায় তবুও হাটলে কিছু পথ তো কমবে। কিন্তু কিলো পথের কতটুকুই বা হেটে চলতে পারবো। আসলে সেই মুহূর্তে কি করা উচিত ভেবে না পেয়েই মূলত হাটা শুরু করা। এখানে বলে রাখা ভালো তখন আমার বাসা ছিল বিশ্ব কলোনীর বি ব্লকে।

এদিক ওদিক তাকাচ্ছি আর পথ হাটছি। হাটতে হাটতে খুলশি থানার কাছে পৌছে গেছি তখন উল্টো দিক থেকে একটা সিএনজি আসছে দেখে আশান্নিত হলাম। সিএনজি টা সোজা আমার কাছে এসে থেমে গেল এবং আমাকে ভিতরে উঠে বসার জন্য বলল। আমি বললাম, বিশ্ব কলোনী যাবে?

উঠে বসেন। ড্রাইভারের সংক্ষিপ্ত জবাব।

আমি জানতে চাইলাম, ভাড়া কত?

ড্রাইভার বিরক্ত হয়ে আমাকে বললেন ভাই আপনি যাবেন নাকি আমি চলে যাব?

আমি বিনয়ের সাথে বললাম। ভাই ভাড়া ঠিক না করে কিভাবে যাব!

ভাড়া লাগবে না। জবাব দিলেন ড্রাইভার।

মনে সন্দেহ জাগলো বাঁটা ড্রাইভার আমাকে নিয়ে কোন নির্জন জায়গায় গিয়ে সাথের মানি ব্যাগ মোবাইল কেড়ে নিয়ে চলে যাবে নাতো? যে সন্দেহের জন্য পরে আমি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার নিকট মনে মনে ক্ষামা চেয়ে নিয়েছি। জানিনা আল্লাহ আমাকে মাফ করেছেন কিনা। যাইহোক মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সিএনজিতে উঠে বসলাম।

এবার ড্রাইভার সাহেব মুখ খুললেন। প্রথমে আমাকে প্রশ্ন করলেন বাসায় টিভি নেই, সংবাদ টংবাদ কিছু শোনেন না মনে হয়। জানতে চাইলাম কেন ভাই? ড্রাইভার বললেন, আবহাওয়ার ১০ নং মহাবিপদ সংকেত চলে ঘুর্ণিঝড় টামেন না কোমেন কি যেন আসতেছে। এই বিপদের সময় বাসা থেকে কেউ বের হয়! আমি চিটাগং মেডিকেলে একটা ডেলিভারী রোগী নিয়ে গিয়েছিলাম। তানাহলে আমিও বাইরে বের হতাম না। আপনি যখন টাভা রেষ্টুরেন্ট এর গলির মুখে দাড়িয়ে যে সিএনজি ওয়ালাকে হাত ইশারা করে থামতে বলেছিলেন সে আমি। ভেবে ছিলাম ভাড়া নেব না। কিন্ত ঝাউতলা পার হওয়ার পর মনে হল যে লোকটা রাস্তার ধারে দাড়িয়ে আছে সে তো কোনো বিপদে পড়েও রাস্তায় বের হতে পারে। তাই আবার ফিরে এলাম।

ভাই তখন আমি ছোট ছিলাম, ১৯৯০ সালের কথা বিশাল প্রলয়ংকারী এক ঘুর্ণিঝড় চট্টগ্রাম কক্সবার আঘাত হেনেছিল। সেই ঝড়ে আমার ফুফু ফুফাতো ভাই মারা যায়। এর পর থেকে আমি জানি ঝড়ের তান্ডব কত ভয়াবহ হয়, তাই বিবেকের দাবীকে ফেলতে না পেরে আবার ফিরে এলাম। আমাকে ভাড়া দেওয়া লাগবে না ভাই আপনি যেখানে যাবেন আমি আপনাকে সেখানে পৌছে দিব। কথা গুলো বলতে বলতে লোকটি কেদেঁ দিলেন। আমি মানুষটিকে কিভাবে কি ভাষায় শান্থনা দেব ভেবে পেলাম না। আরও টুকিটাকি কথা বলতে বলতে আমার গন্তব্যে পৌছে গেলাম। লোকটিকে ভাড়া দিতে চাইলাম কিন্তু নিলেন না, বললেন এখানেই আমার গ্যারেজ এমনিতেই আমাকে এখানে আসতে হত। তাছাড়া আজ আপনি না হয়ে যদি আমার ফুফাতো হত তাহলে কি তার থেকে টাকা নিতাম!

লোকটিকে সালাম দিয়ে আমার বাসার দিকে রওনা হলাম। মনে মনে ভাবলাম এত অন্যায় এত অবিচার এত দুনীর্তীর মধ্যেও এখনও কিছু লোক আছে যারা মানবিক, যাদের কারনে হয়ত আল্লাহ রব্বুল আলামীন এখনও আমাদেরকে আলো বাতাস পানি দিয়ে বাচিয়ে রেখেছেন।

ছবিটি প্রতিকী, ইন্টারনেট থেকে সংগৃহিত।

ম.ম.শ ইসলাম প্রিয়

এই লেখাটি ’প্রতিচ্ছবি’র সম্পাদনা পরিষদ কর্তৃক কোনরূপ সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত। লেখাটির সর্ব-স্বত্ব লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। লেখকের অনুমতি ব্যতীত এবং লেখকের নাম ছাড়া অন্য মিডিয়াতে লেখাটি প্রকাশ করা কপিরাইট আইনে দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে বিবেচিত হবে।

Add comment

Most popular

Most discussed